ভাতের থালা, দুটো জীবন এবং আমাদের সমাজ

মো: আনিস উদ্দীন

এক থালা ভাত—সাধারণ দৃষ্টিতে যা কেবল একজন মানুষের এক বেলার সামান্য আহার, ক্ষুধার্ত ও পরিশ্রান্ত পেটের একটুখানি পরম স্বস্তি। কিন্তু সেই এক থালা অন্নই যখন দুটো তাজা, উদীয়মান প্রাণের অকাল ও নৃশংস মৃত্যুর অনুঘটক হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা আর সাধারণ কোনো অপরাধ বা বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ডের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তা সরাসরি আমাদের সমাজব্যবস্থা, শাসনকাঠামো এবং সার্বিক মানবিকতার মুখে এক বিশাল ও কঠিন প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়। সম্প্রতি দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে (খুবি) ঘটে যাওয়া দুটো নির্মম ও হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের সেই চরম ও অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

ঢাকায় ঘটে যাওয়া তোফাজ্জলের ঘটনাটি আমাদের আধুনিক সভ্যতার নির্মমতম মুখচ্ছবি। তোফাজ্জল ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন এক তরুণ, যার এই কন্টকাকীর্ণ পৃথিবীতে হয়তো আপন বলে আর কেউ বেঁচে ছিল না। তীব্র ক্ষুধার তাগিদে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ঢুকে পড়া তোফাজ্জল কোনো বৈভব চাননি, চেয়েছিলেন শুধুই একটু ভাত। তাকে ভাত দেওয়াও হলো, আর সেও চরম তৃপ্তি নিয়ে তা খেল। কিন্তু করুণ সত্য হলো, সেই ভাতের থালা খালি হওয়ার পরেই নেমে এলো অবর্ণনীয় বিভীষিকা। চুরির অপবাদে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মধ্যযুগীয় কায়দায় পিটিয়ে হত্যা করা হলো। যে অসহায় ছেলেটি একটু আগেই নিভৃত আনন্দে ভাত খাচ্ছিল, কিছুক্ষণের মধ্যেই তার নিথর ও রক্তাক্ত দেহ গড়িয়ে পড়লো দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের মাটিতে।

অন্যদিকে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রায় একই রকম এক গভীর মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। তুচ্ছ খাবারের ঘটনা কিংবা সামান্য বিবাদকে কেন্দ্র করে চরম সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, আর তার জেরে কেড়ে নেওয়া হয় আরেকটি তরতাজা প্রাণ। দুটো ভিন্ন স্থান, ভিন্ন প্রেক্ষাপট—কিন্তু ট্র্যাজেডির মূল সুর একই। বিশ্ববিদ্যালয়, যা মুক্তচিন্তা, পরমতসহিষ্ণুতা, প্রজ্ঞা আর মানবিক মূল্যবোধ চর্চার সর্বোচ্চ তীর্থস্থান হওয়ার কথা ছিল, সেখানেই সামান্য এক থালা ভাতের বিপরীতে জবাব এলো প্রাণঘাতী নৃশংসতায়।

তোফাজ্জলের মতো মানুষেরা এই বৈষম্যপীড়িত সমাজে সবচেয়ে অসহায়—যাদের মাথার ওপর অভিভাবকের ছায়া নেই, থাকার মতো আশ্রয় নেই, এমনকি নিজের মৌলিক অধিকারটুকু চেয়ে নেওয়ার শক্তি বা সচেতনতাও নেই। তারা সমাজে কোনো বৈভব বা সম্মান দাবি করে না; তারা শুধু একটু সহানুভূতি আর এক লোকমা খাবারের প্রত্যাশা করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শিক্ষার আলোয় আলোকিত দাবি করা আমাদের এই সমাজের মধ্য থেকে সহানুভূতির সেই মৌলিক মানবিক বোধটুকু কখন কীভাবে উবে গেল?

ভাত বাঙালির বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় অবলম্বন ও সংস্কৃতির প্রতীক। অথচ সেই অন্নই যখন কারও মৃত্যুর পরোয়ানা হয়ে নেমে আসে, তখন নির্দ্বিধায় বুঝতে হবে আমাদের সামাজিক বিবেক আজ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ও সুপ্ত। এ কেবল দুটো তরুণের করুণ মৃত্যু নয়; এ আমাদের সামগ্রিক সামাজিক মূল্যবোধ, শিক্ষাব্যবস্থা ও মানবিকতার এক চূড়ান্ত পরাজয়। এখন আর নীরব দর্শক হয়ে থাকার সুযোগ নেই। সময় এসেছে এই প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক নির্মমতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর, যেন আর কোনো তোফাজ্জলকে এক থালা ভাতের মাশুল নিজের পরমায়ু দিয়ে শোধ করতে না হয়।




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন